সহজ সরল স্বভাবের সাহসী মানব সম্প্রদায়েরে একটি নাম হলো সাঁওতাল। এদের আরেক নাম মান্দি,কেউবা সান্তাল,হোর বা সাতাল বলেও জানেন। পৃথিবীর অনেক জাতি সম্প্রদায়ের মতো তাদের ও বিশ্বাস তারাই সৃষ্টির আদি মানব মানবী। পিলচু বুড়ি ও পিলচু হরম এর সাত জোড়া সন্তান থেকে এদের উদ্ভব বলেই এরা সাতটি গোত্রে বিভক্ত। তবে পরবর্তীতে আরো পাঁচটি গোত্রে এরা বিভক্ত হয়।
মিথি মার্ডি নামের এক সাঁওতালী মেয়ের সাথে আলাপ হলে তিনি জানান, তাদের দূর্বিসহ,জীবন যাপনের কথা। আমাদের সমাজের নারীদের মতো তারাও নানা রকম বঞ্চনা,নির্যাতন,নিপিরনের শিকার। যদিও লোকমুখে প্রচলিত সাঁওতাল নারী পুরুষ সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করে, কিন্তু তা আদিবাসী সমাজব্যবস্থায় নারীদের দুরাবস্থার কথা লুকিয়ে রাখার প্রয়াশ মাত্র। সাঁওতাল সমাজের সম্পত্তিতে ছেলেরাই উত্তরাধিকারী, নারীরা সম্পত্তির কানাকড়িও পান না, যদি কারো পুত্র সন্তান না থাকে তবেই কন্যারা সম্পত্তির ভাগ পান। সাঁওতালী নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলার পূর্বে আমাদের সমাজে নারীর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার।
আমাদের পুরুষতান্ত্রীক সমাজে সম্পদ উৎপাদধের মাধ্যম ও শ্রম ইত্যাদিতে পুরুষের কর্তৃত্বের বৈধতা স্বীকার করে, সমাজপতি পুরুষ হওয়ার কারনে নারীদের পদে পদে শৃঙ্খলিক করে রাখা হয়। পুরুষতন্ত্র সংসার ও পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মূল্যবোধ। নারী-শিশুর খেলনা থেকে শুরু করে,শিক্ষা পেশা চলাচলের ধরন পর্যন্ত ভিন্ন। পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধে নারীরা নিকৃষ্ট, পুরুষ বিনা তাদের জীবন অচল। তাই জন্মলগ্ন থেকে নারীরা বৈষ্যমের শিকার আর এই বৈষম্যকে নারীরা যেন মেনে নেয় তাই তৈরি করা হয় মুল্যবোধ।
নারীদের আড়াল করে রাখতে পুরুষের আছে যৌন আগ্রাসী ভাষা। এখন বলতে পারেন নারীরা অনেক স্বাধীন,তাই তারা আজ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদার্পন করতে পারছে,সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নারীরা যে কারনেই পদার্পণ করুক না কেন পুরুষের সন্তুষ্টি তার পরিনতি। সাঁওতাল নারীরাও একই পরিস্থিতির স্বীকার।
অর্থনৈতিক অবস্থা তাদের এতই দূর্বল যে দিনান্তে তাদের শাক অন্য জোটে না। দারিদ্রতার কড়াঘাতে তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। জন্মলগ্ন থেকেই অভিশাপের গ্লানী তাদর নিত্যসঙ্গী। শৈশব থেকে কৈশরে পদার্পন করতে না করতেই তাদের বাল্যবিবাহ দেয়া হয়। শুরু হয় আরেক সংগ্রামী জীবন।
সাঁওতালী পুরুষেরা স্বভাবত অলস। সংসারের দায়ভার নারীর হাতে তুলে দিয়ে তারা নিশ্চিন্তে দিনাতিপাত করেন। এদিকে সন্তানের ক্ষুধার তারনা সইতে না পেরে মায়েরা বেড়িয়ে পরে কাজের সন্ধ্যানে। কাজের মুল যোগানদাতা বাঙ্গালি পুরুষের কাছে তাদের কাজ মিলে ঠিকি তবে ন্যায্য মুল্য মিলে না, সামান্য মজুরি দিয়ে তাদের কাজ করায়, পাশাপাশ নানা রকম যৌন নিপিরন তো আছেই, লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে নীরবে সহ্য করে। কেননা তাদের সমাজে তাকেই কলঙ্কিনী বলে একঘরে করে দেওয়া হয়, সামাজিক সকল আচার অনুষ্ঠান থেকে তাকে দূরে থাকতে হয়। সাঁওতালী পুরুষ দ্বারা যারা নির্যতীত হন তার সাথে যদিও ঐ নারীর বিয়ে দেওয়া হয় তবুও তাকে কলঙ্কিনী হিসেবেই দেখা হয়।
উপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত কায়েমি স্বার্থের পক্ষাবলম্বনকারী রাষ্ট্র নানা অজুহাতে উন্নয়নের নামে ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের সম্পত্তি, সংস্কৃতি এমনকি ভাষা।
অর্থাভাবে পারেনা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে,যদিও মুষ্টিমেয় কিছু মেয়ে লেখাপড়া করে তা মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।মিথি মার্ডির সাথে আলাপ শেষে ফিরছিলাম। পথের ধারে দেখতে পেলাম গোটা চারেক নারীশিশু হাত ধরে তাদের ভাষায় গান গাচ্ছে।
‘বাংলাদিসাম মজিদিসাম
মুজবাহাতে পেরে আকা,
সাজা ওয়াকান দালে নালে হয়তে দালায় দালায়।’
অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় সেটা হলো,
‘বাংলাদেশ মধুর দেশ ফুলে ফলে ভরা,
সাজানো তো গাছের পাতা বাতাসে ওরে।’
আজ দেশকে ভালোবেসে যে সাঁওতালী নারীশিশুরা গান গাচ্ছে কৈশরে পদার্পন করে তারাও একদিন এই দেশের মানুষের হাতেই হবে নির্যাতনের শিকার, হারিয়ে ফেলবে বাঁচার মানে, তাদের নির্যাতিত মন ভয়ার্ত চোখ আর বলবেনা বাংলাদেশ তোমায় ভালবাসি।
এই নীপিড়ণের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য সাঁওতালদের মানবাধিকার রক্ষার প্রথাগত আইন ও কল্যানকর অংশটুকু রেখে বাকিটা সাঁওতাল অধিবাসী নারীর অধিকার ও পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত করে সরকার ও রাষ্ট্র যদি এগিয়ে আসে ও দায়িত্ব পালন করে তবেই সাঁওতালী নারীদের অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব।
লিখেছেনঃ জলস্পর্শী তটিনী
শিক্ষার্থী সন্মান চতুর্থ বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বীরগঞ্জ সরকারী কলেজ।